বিজ্ঞানী আবদুস সালাম
- সাদ আব্দুল ওয়ালী
বিজ্ঞানের বিশাল জগতে পদার্থ বিজ্ঞানের ভূমিকা অগ্রগণ্য। আর পদার্থ বিজ্ঞান চর্চা ও গবেষণায় যেসব বিজ্ঞানী কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন তাঁদের মধ্যে পাকিস্তানের অধ্যাপক আবদুস সালাম অন্যতম। বিশ্ববাসীর কাছে এ তথ্য প্রচলিত হল ‘সুইডিশ একাডেমী আর সায়েন্স’ যেদিন ১৯৭৯ সালে পদার্থ বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে নোবেল পুরস্কার ঘোষণা করলেন। পদার্থ বিজ্ঞানে যে তিনজন নোবেল পুরস্কার পান বিজ্ঞানী আবদুস সালাম তাঁদেরই একজন।
- সাদ আব্দুল ওয়ালী
[১৯২৬-১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দ]
অন্যতম অবদানসমূহ ঃ
১. নিরপেক্ষ তড়িৎ’ তত্ত্ব আবিষ্কার
২. ১৯৭৯ সালে নোবেল পুরস্কার লাভ
বিজ্ঞানী আবদুস সালাম জন্মগ্রহণ করেন ১৯২৬ খ্রীস্টাব্দ পাকিস্তানের লাহোর শহরের দু’শ কিলোমিটার উত্তর পশ্চিমে ‘ঝাঙ’ নামক শহরে। তাঁর বাবা চৌধুরী মুহম্মদ হোসেন ছিলেন একটা সরকারি হাইস্কুলের শিক্ষক। কিছুদিন পর তিনি শিক্ষকতা ছেড়ে দিয়ে শিক্ষা বিভাগের জেলা বোর্ড অফিসে প্রধান করণিক হিসেবে যোগ দেন।
ছোটবেলায় তিনি লেখাপড়ায় ছিলেন অত্যন্ত মনোযোগী। চার বছর না পেরোতেই প্রচুর কবিতা মুখস্ত করেছিলেন। ইসলামের ইতিহাসের অনেক কাহিনী বলে যেতে পারতেন। কোরান শরীফ মুখস্ত বলতেন না দেখে। স্কুল-কলেজে তিনি মেধাবী ছাত্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। বলা যায় সেসব প্রতিষ্ঠানের রেকর্ড ভঙ্গ করেছিলেন। তিনিই প্রথম পাকিস্তানী যিনি নোবেল পুরস্কার পান।
পদার্থ বিজ্ঞানী আবদুস সালামের ইচ্ছা ছিল লেখাপড়া শেষ করে সিভিল সার্ভিসে যোগ দিবেন। কিন্তু সে ইচ্ছে আর পূরণ হলো না। লাহোর
থেকে অঙ্কশাস্ত্রে এম.এ সম্পন্ন করে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চ শিক্ষা
লাভের সময় তিনি ডিরাক প্রমুখ প্রখ্যাত পদার্থ বিজ্ঞানীদের শিক্ষাগুরু
হিসেবে পান। সালামের মধ্যে অনন্য প্রতিভা সুপ্ত অবস্থায় রয়েছে বুঝতে পেরে ডিরাক তাকে পদার্থ বিজ্ঞানী হবার জন্য উৎসাহিত করেন। আবদুস সালাম সহসা তাঁর ইচ্ছা পরিবর্তন করেন। একত্রিশ বছর বয়স হবার পূর্বেই বিজ্ঞানী আবদুস সালাম রয়াল সোসাইটির সভ্য মনোনীত হন। ১৯৫৭ সালে তিনি লন্ডনের ইস্পিটরিয়াল কলেজ অর সায়েন্স এন্ড টেকনোলজির তত্ত্বীয় পদার্থ বিজ্ঞানের অধ্যাপক হিসেবে কাজ করেন। এছাড়া তিনি ইতালির ত্রিয়োস্তেতে অবস্থিত ‘ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার থিওবেটিক্যাল ফিজিক্স এর ডিরেক্টর। মূলত তার উদ্যোগে এই বিশিষ্ট গবেষণা কেন্দ্রটি গড়ে উঠেছে।
১৯৭৯ সালে বিজ্ঞানী আব্দুস সালাম ও অপর দু’জন মার্কিন পদার্থবিজ্ঞানী যথাক্রমে অধ্যাপক স্টিভেন ভিনুবার্গ, অধ্যাপক শেলডান এল গ্লাশো সম্মিলিতভাবে নোবেল পুরস্কার পান। পদার্থবিজ্ঞানে যে অনন্য সাধারণ কাজের জন্য এই তিন পদার্থবিজ্ঞানীকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়, বিজ্ঞানীদের ভাষায় তা ’ইউনিফায়েড ফিল্ড থিওরি’ একক ক্ষেত্রতত্ত্ব নামে পরিচিত।
পদার্থবিজ্ঞানীদের অভিমত, বিশ্ব ব্রক্ষ্মান্ডে বস্তুকণা থেকে আরম্ভ করে গ্রহ, নক্ষত্র ইত্যাদির সৃষ্টি, রূপান্তর ও কার্যকলাপের মূলে আছে চার রকম মৌলিক বল বা ফোর্স। প্রথমটি হচ্ছে মহাকর্ষ বল, দ্বিতীয়টি স্ট্রং ফোর্স বা প্রবল বল, তৃতীয়টি তড়িৎ †PФ^K বল এবং চতুর্থটি ’উইক ফোর্স’ বা মৃদু বল।
এই চারটি বলে পৃথক সত্তা আছে বলে ধারণা করা হয়। বিজ্ঞানীদের ধারণা ভিন্ন রকম। এই চার রকম বলের উৎস আসলে একই। প্রত্যেক রকম বলের প্রভাব এক একটি নির্দিষ্ট গন্ডীর বা ক্ষেত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। বিজ্ঞানী আইনস্টাইন থেকে শুরু করে পরবর্তীকালের অনেক প্রখ্যাত পদার্থ বিজ্ঞানীই এই চার রকম বলের ক্ষেত্রের মধ্যে একটা mgš^q সাধনের প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন, তাঁদের সবারই লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য ছিল একটাই, সেটা হচ্ছে এমন একটি তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করা যার দ্বারা প্রমাণিত হবে একই সত্তায় চতুর্থমুখী প্রকাশ। আর এই তত্ত্বটিকেই বিজ্ঞানীরা আখ্যা দিয়েছেন “ইউনিফায়েড ফিল্ড থিওরি বা একীভূত ক্ষেত্রতত্ত্ব”। এই প্রচেষ্টায় সবাই সফল না হলেও বিজ্ঞানী আব্দুস সালাম এবং তাঁর সতীর্থ দুই মার্কিন বিজ্ঞানী আংশিক সাফল্য লাভ করতে সক্ষম হন। এই অসামান্য কৃতিত্বের ¯^xK…wZ¯^iƒc এরা তিনজন একত্রে সম্মানিত হয়েছেন নোবেল পুরস্কারে। বিজ্ঞানী আব্দুস সালামের আর একটি কৃতিত্ব হচ্ছে ‘ওমেগামাইনাস’ নামে এক রকম মৌলকণা আবিষ্কার।
১৯৮১ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বার্ষিক সমাবর্তন উৎসবে ভাষণ দেবার জন্য অধ্যাপক আব্দুস সালামকে আমন্ত্রণ জানান হয়। তিনি এতে একটি শর্তারোপ করেন। আর সেটি হচ্ছে তাঁর শিক্ষাগুরু অধ্যাপক শ্রী অনিলেন্দু গঙ্গোপাধ্যায়কে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে সম্মানিত করা। শিক্ষাগুরুকে সম্মানিত করার পর বিজ্ঞানী আব্দুস সালাম কলকাতায় আসেন।
বিজ্ঞানী আব্দুস সালাম জীবনের শেষ মুহূর্তে এসে আক্রান্ত হন পারকিনসন রোগে। আর এই রোগেই তাঁর মৃত্যু হয় ১৯৯৬ সালের ২১ b‡f¤^i| আমরা হারিয়েছি একজন প্রতিভাবান বিজ্ঞানীকে।
No comments:
Post a Comment