Wednesday, February 27, 2013

বিজ্ঞান-মনীষাঃ স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু


বিজ্ঞানী স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু 
- সাদ আব্দুল ওয়ালী

তৎকালীন ভারতবর্ষ বর্তমান বাংলাদেশের একজন বিজ্ঞানী যিনি একমাত্র বিজ্ঞানী যিনি প্রমাণ করতে পেরেছিলেন, জীবদেহের মত বৃক্ষেরও প্রাণ আছে। উদ্ভিদ বিজ্ঞান নিয়ে তিনি জীবনের অধিকাংশ সময় নিজেকে গবেষণার কাজে আত্মনিয়োগ করেছিলেন। আমরা অনেকে হয়তো তাঁর নাম জেনে থাকবো। তিনি হচ্ছেন জ্ঞান তাপস বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু।
অন্যতম অবদানসমূহ:  
1.  জীবদেহের মত বৃক্ষেরও প্রাণ আছে- এটি প্রমাণ করেছিলেন
2.  উদ্ভিদের বৃদ্ধিমাপক 'ক্রেস্কোগ্রাফ'’ নামক বিখ্যাত যন্ত্রের উদ্ভাবন
3.  ১৯১৭ সালের ৩০ নভেম্বর বিজ্ঞান মন্দির প্রতিষ্ঠা
4.  উদ্ভিদের দেহের উত্তেজনার বেগ নিরুপক সমতল তরুলিপি যন্ত্র রিজোনাষ্ট রেকর্ডার এর উদ্ভাবক 

বিজ্ঞানী স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু ১৮৫৮ সালের ৩০ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেছিলেন বাংলাদেশের ঢাকা পোনিয়ার বিক্রমপুরের বাড়িখাল গ্রামে তাঁর পিতা ভগবানচন্দ্র ছিলেন ফরিদপুরের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট তিনি ছিলেন তৎকালীন বিট্রিশ রাজভুক্ত ভারতের এক ডাকসাইটে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট
 
স্থানীয় স্কুলে পড়া শেষ হলে  তার পিতা তাকে ভর্তি করেছিলেন কলকাতার হেয়ার  স্কুলেএখানে ইংরেজিতে আশনরূপ উন্নতি না হওয়ায় তিনি পদার্থবিদ্যা নিয়ে ভর্তি হলেন সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুলে।  ছাত্র হিসেবে তিনি ছিলেন যেমন মেধাবী তেমনি পড়াশুনায় তাঁর ছিল গভীর মনোযোগএর পর সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে ভর্তি হলেন
 


১৮৭৭ সালে এফ. পরীক্ষায় কৃতকার্য হন এর তিন বছর পর বিজ্ঞান বিভাগে বি- পাশ করেন উচ্চশিক্ষার জন্য ১৮৮০ সালে জগদীশচন্দ্র বসু বিলাতের পথে যাত্রা করেন লন্ডনে মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হলেন কিন্তু মরদেহ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে গেলেই অসুস্থ হয়ে যান অবশেষে ডাক্তারী পড়া ছেড়ে কেমব্রিজের ক্রাইস্ট কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হলেন কেমব্রিজে রয়েছে যে কোন বিজ্ঞানীর স্বপ্নের এক গবেষণাগার-ক্যাভেনডিশ ল্যাবরেটরি সেই গবেষণাগারে তখন জগৎখ্যাত বিজ্ঞানী লর্ড র‌্যালে র‌্যালের গবেষণা সহায়ক হিসেবে কিছুকাল কাজও করেছিলেন এখানে আশাতীত সাফল্যও পেয়েছিলেন 
 

তিনি একই সাথে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.এস.সি ডিগ্রি কেমব্রিজ থেকে ট্রাইপস পাশ করলেন ভারতবর্ষে ফিরে আসার আগে ইংল্যান্ডের পোষ্ট মাষ্টার জেনারেল ভারতের বড়লাট লড রিপনকে আদীশচন্দ্র বসু সন্বন্ধে চিঠি লিখে জানিয়ে দিলেন
 
লর্ড রিপন তখন বাংলার গর্ভনরকে লিখে দিলেন যেনো তাকে শিক্ষা বিভাগে কোন ভাল পদে চাকরি দেওয়া হয় সাহেবেদের একটা ধারণা ছিলো ভারতীয়রা বিজ্ঞান শিক্ষা অনুপযুক্ত একারণে নানা তালবাহানা চলতে থাকলো শেষ পর্যন্ত লর্ড রিপনের আদেশে তাঁকে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে অস্থায়ী অধ্যাপকের পদে নিযুক্ত করা হলো পদে ইংরেজ অধ্যাপকেরা যা বেতন পেতেন, জগদীশচন্দ্রকে তার দুই-তৃতীয়াংশ দেওয়া বেতন স্থির হলো আবার অস্থায়ী বলে বেতনের অর্ধেক দেওয়া হত

 


কিন্তু জগদীশচন্দ্র বসু বৈষম্য মেনে নিতে পারলেন না প্রতিবাদ জানালেও কেউ কোনো কর্ণপাত করল না শেষ পর্যন্ত কোনো বেতন নিবেন না এমন সিদ্ধান্ত নিলেন তবুও নিয়মিত ক্লাস নিতে থাকলেন
 


এমতাবস্থায় সংসারে অভাব অনটনের মাঝে ১৮৮৭ সালে জগদীশ চন্দ্র অবলা দাসকে বিয়ে করলেন অবলা দাস ছিলেন উচ্চ শিক্ষিতা বিদুষী এদিকে অধ্যাপনার এক বছরের মধ্যেই জগদীশ চন্দ্র তার গবেষণাপত্র ইংল্যান্ডের রয়েল সোসাইটিতে পাঠালেন শীঘ্রই তা প্রকাশিত হলো রয়েল সোসাইটির তরফ থেকে বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য বৃত্তি দেওয়া হলো এছাড়া লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে D.Sc উপাধি দিল ইতোমধ্যে তিন বছর শেষ হতেই বিনা পারিশ্রমিকে কলেজে অধ্যাপনা অসহযোগ আন্দোলনের কাছে নতিস্বীকার করতে বাধ্য হলো কলেজ কর্তৃপক্ষ সুদিন এলো জগদীশচন্দ্র বসুর তিনি ইংরেজ অধ্যাপকের সমান বেতন দিতে স্বীকৃতি হল তাই নয়, তিন বছরের সমস্ত প্রাপ্য মিটিয়ে দিল
 

বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র গবেষণাগারে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ছাড়াই ইলেকট্রিক রেডিয়েশন বিষয়ে গবেষণা করতেন বিদ্যুৎ উৎপাদক ইথার তরঙ্গের কম্পনের দিকে পরিবর্তন বিষয়ক প্রবন্ধটি (যা তাঁর প্রথম প্রবন্ধ) তিনি এশিয়াটিক সোসাইটিতে পেশ করেছিলেন পরের প্রবন্ধগুলো ইংল্যান্ডের ইলেকট্রিশিয়ান পত্রিকায় প্রকাশ করেন এসময় বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বিনা তারে বৈদ্যুতিক তরঙ্গের মাধ্যমে শব্দকে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় কিভাবে পাঠানো যায় সে বিষয়ে গবেষণা করছিলেন একই বিষয়ে গবেষণা করছিলেন আমেরিকার বিজ্ঞানী লজ, ইতালীতে মার্কনী কিন্তু বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বিষয়ে ছিলেন অগ্রণী
 


১৮৯৫ সালে তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজে বিষয়ে পরীক্ষা করেন বেতার যন্ত্র তখনও আবিষ্কৃত হয় নি  কলকাতার টাউন হল সাঁইত্রিশ বছরের যুবক জগদীশ যন্ত্রপাতি নিয়ে তৈরি হয়ে আমন্ত্রিত শ্রোতাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন, সর্বসমক্ষে তা পরীক্ষা করে দেখাতে চান এর পরেই তিনি বিনাতারে তাঁর উদ্ভাবিত যন্ত্রের মাধ্যমে নিজের বাসা থেকে এক মাইল দূরে কলেজে সঙ্কেত আদান-প্রদানের ব্যবস্থা করলেন
 

wireless telegraphy সন্বন্ধে তাঁর আবিষ্কার ইংল্যান্ডে সাড়া পড়ে গিয়েছিল  একটি বিখ্যাত ইলেকট্রিক কোম্পানী তাঁর পরামর্শ মত কাজ করে wireless telegraphy বিষয়ে প্রভূত উন্নতি করতে সক্ষম হয় অর্থনৈতিক কারণে জগদীশচন্দ্রের গবেষণা ব্যাহত হয়েছিল ১৮৯৬ সালে মার্কনী wireless telegraphy-i প্রথম পেটেন্ট নিলেন
 
বছর জুলাই মাসে ইউরোপে রওয়ানা হলেন বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র দশ বছর আগে পড়াশুনা শেষ করে দেশে ফিরেছিলেন গবেষণার ফলাফল ইউরোপীয়দের কাছে বলবেন, এই ইচ্ছে ছিল তাঁর কলকাতার টাউন হলে যে যন্ত্র থেকে তরঙ্গ তৈরি করেছিলেন তিনি, সেই যন্ত্রটি সাথে নিয়ে গেলেন ব্রিটেনে, জার্মানী ফ্রান্সের বিভিন্ন জায়গায় বিষয়ে বক্তৃতা করলেন শ্রোতাদের মাঝে সেসময় ছিল জে জে থমসন, যিনি ইলেকট্রনের আবিষ্কারক আর ছিলেন বিখ্যাত পদার্থবিদ লর্ড কেলভিন

 

অবশেষে জয়ের মালা নিয়ে দেশে ফিরলেন বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু সেসময় তাঁকে অভিনন্দন জানাতে উপস্থিত হয়েছিলেন আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র, ডা. নীলরতন সরকার, শিবনাথ শাস্ত্রী এবং আরও অনেকে
লন্ডনে বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র অনুভব করেছিলেন বিদেশে বিজ্ঞানীরা কত আধুনিক গবেষণাগারের সুযোগ পাচ্ছে তাঁর অনুরোধে লর্ড কেলভিন অন্য বিজ্ঞানীরা ভারত সচিবের কাছে গবেষণার সুযোগ-সুবিধা প্রদান করার জন্য অনুরোধ জানিয়েছিলেন ভারতবর্ষে এসে তিনি বিষয়ে আলাপ-আলোচনা শুরু করলেন, মূলত তাঁরই প্রচেষ্টায় ১৯১৪ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজে একটি আধুনিক ল্যাবরেটরি গড়ে উঠল
 
ভারতবর্ষে এসে তিনি আবার অধ্যাপনার কাজে নিয়োজিত সেই সঙ্গে গবেষণাও চালিয়ে যেতে থাকলেন সময়েই তাঁর উদ্ভিদ বিষয়ক যুগান্তকারী গবেষণা আরম্ভ করেন ১৯০০ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক পদার্থবিদ্যা বিষয়ক সম্মেলনে যোগ দিলেন বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র এখানে তাঁর বক্তৃতায় বিষয় ছিল জীব জড়ের উপর বৈদ্যুতিক সাড়ার একাত্বতা সেখানে জীব জড়ের সম্পর্ক বিষয়ে ব্রিটিশ এসোসিয়েশনের ব্রাডফোর্ড সভায় বক্তৃতা দিলেন

 

বৈজ্ঞানিক গবেষণার ভিত্তিতে বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র ১৯০২ সালে রচনা করলেন ‘Responses in the living and non living’| ১৯০৬ সালে প্রকাশিত হল তাঁর দুটি গ্রন্থের মধ্যে তিনি প্রমাণ করলেন উদ্ভিদ বা প্রাণীকে কোনভাবে উত্তেজিত করলে তা থেকে একইরকম সাড়া মেলে তিনি ইংল্যান্ড এবং আমেরিকায় গেলেন আমেরিকার বিজ্ঞানীরা তাঁর আবিষ্কার সন্বন্ধে যথেষ্ট আগ্রহী ছিলেন ইংল্যান্ডের বিজ্ঞানীগণ ধীরে ধীরে গবেষণার সত্যতাকে স্বীকার করে নিচ্ছিলেন
 
দেশে ফিরেই বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র তৃতীয় পর্যায়ের গবেষণা শুরু করলেন উদ্ভিদ প্রাণীদের দেহকলার মধ্যে তুলনামূলক গবেষণা গবেষণার পর্যায়ে তিনি উদ্ভাবন করলেন তাঁর বিখ্যাত যন্ত্র ক্রেস্কোগ্রাফ যন্ত্রের মাধ্যমে কোন বস্তুর অতি সূক্ষ্মতম সঞ্চালনকেও বহুগুণ বৃদ্ধি করে দেখানো সম্ভবপর

 

আবার ১৯১৪ সালে তিনি চতুর্থবার ইংল্যান্ড গেলেন বার যাত্রার সময় তিনি সঙ্গে করে শুধু যে তাঁর বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি নিয়ে গেলেন সেই সঙ্গে লজ্জাবতী বনচাঁলড়াল গাছ গাছগুলো সহজে সাড়া দিতে পারে তিনি অক্সফোর্ড ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে, এছাড়া রয়েল সোসাইটিতেও তাঁর উদ্ভাসিত যন্ত্রের সাহায্যে প্রমাণ করলেন, জীবদেহের মত বৃক্ষেরও প্রাণ আছে, তারাও আঘাতে উত্তেজনায় অণুরণিত হয়
 
১৯১৩ সালে জগদীশচন্দ্রের চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার কথা ছিল কিন্তু তাঁর চাকরির মেয়াদ আরো দুবছর বাড়ানো হয় ১৯১৫ সালে সুদীর্ঘ ৩১ বছর অধ্যাপনা করার পর চাকরি জীবন থেকে অবসর নিলেন চাকরি জীবন থেকে অবসর নিলেও গবেষণার কাজ চলতে থাকলো সময় তিনি লন্ডনের রয়েল ইনস্টিটিউটের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন আর গবেষণা প্রতিষ্ঠানের আলোকে ভারতবর্ষে ধরনের গবেষণা প্রতিষ্ঠান গড়ার পরিকল্পনা করলেন পরিচিতজনের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে তাঁর ইচ্ছার কথা প্রকাশ করলেন কাজে অনেক মানুষ এগিয়ে এলেন এছাড়া দেশের বিভিন্ন প্রান্ত ঘুরে ঘুরে জগদীশচন্দ্র অর্থ সঞ্চয় করলেন তাছাড়া তিনি নিজের সমস্ত জীবনের উপার্জিত অর্থ প্রতিষ্ঠানে দিলেন সরকারে তরফ থেকে বার্ষিক অনুদান নির্ধারণ করা হলো ১৯১৭ সালে ৩০ নভেম্বর জগদীশচন্দ্রের ৫৯তম জন্মদিনে প্রতিষ্ঠা হল বিজ্ঞানমন্দির তাঁর প্রতিষ্ঠান শুধু ভারতবর্ষ নয, সমগ্র বিশ্বের একটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ গবেষণাগার

 


ভারতবর্ষ এই মহান বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসুকে হারালেন ১৯৩৭ সালের ২৩ নভেম্বর কিন্তু মৃত্যুর পূর্বে তিনি তাঁর লালিত স্বপ্ন পূরণ করতে সক্ষম হয়েছিলেনবিজ্ঞান মন্দিরপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমে
 
তাঁর রচিত গ্রন্থাবলী
অব্যক্ত (১৩২৮ বঙ্গাব্দ)
 
1. Responses in the Living and Non-living (1902)
2. Plant Responses as a Means of Physiological Investigations (1906)
3. Comparative Electrophysiology (1907)
4. Physiology of the Asent of Sap (1923)
5. Physiology of Photosynthesis (1924)
6. Nervous Mechanism of Plats (1925)
7. Collected Physical Papers (1927)
8. Motor Mecanism of Plants (1928)
9. Growth and Tropic Movement in Plants (1929)
(লেখাটি সিসটেক পাবলিকেশন্স থেকে প্রকাশিত আমার বই "বিজ্ঞান মনীষা" থেকে নেয়া)
এখানে সংশোধিত আকারে উপস্থাপন করা হলো।আরো সংশোধন করার ইচ্ছা রইল।
 অনুপ্রেরণা: শফিউল ইসলাম, কানাডা (টেক্সটাইল সাইন্স, ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড টেকনোলজিতে পিএইচডি)

No comments:

Post a Comment